শেখ হাসিনা: ‘আঁধার বিদার উদার অভ্যুদয়’

ড. মো: শাহিনুর রহমান

শুভ জন্মদিন, প্রিয় নেত্রী

জনগণের একান্ত প্রার্থনা, গভীরতম কামনার অভীষ্ট ফলস্বরূপ আপনি আজযুগপ্রবর্তক জননেতা হিসেবে পরিগণিত।বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার অগ্রভাগে থেকে আপনি জনগণকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত, সুস্থতা ও শিক্ষায় মানোত্তীর্ণ স্বদেশ প্রতিষ্ঠার দিকে। এ যাত্রাপথে কোনো বাধা, প্রতিবন্ধতা, বৈরিতা, জেল জুলুম, প্রাণসংশয়কারী হামলা কিছুই আপনাকে দমাতে পারেনি, কখনো পারবেও না। বরং যতই আপনার উপর আঘাত আসবে, যতই বাধাবিপত্তি এসে আপনার পথরোধ করতে চাইবে, ততই আপনি আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবেন। আপনার সুবিবেনাপ্রসূত ও সুনিপুণ নেতৃত্বের অনুসরণে গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলতে চলতে আমরা এসব কথা জেনে গিয়েছি। আমরা জানি, আপনার জাদুস্পর্শে সব নেতিবাচকতা রূপান্তরিত হয়ে যায় নবযুগ সৃজনকারী ইতিবাচকতায়।

আপনার পিতা, বাঙালিজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন একজন আদর্শ যুগপ্রবর্তক নেতা। শ্যামল বাংলার জলে হাওয়ায় পরিপুষ্ট এই নেতা উঠে এসেছিলেন সরাসরি বাঙালির সামষ্টিক মুক্তির গূঢ়ৈষণা হৃদয়ে ধারণ করে। জাতির সে চাওয়া তিনি পূর্ণ করেছিলেন, যার প্রমাণ তাঁর জীবনেতিহাসেরপরতে পরতে। কিন্তুজাতির কতিপয় বিপথগামী সন্ত্রাসী পিতার সেই কালজয়ী অবদানের প্রতিদান দিয়েছে চরম কৃতঘ্নতায়।

পিতৃহত্যার মহাপাতকের পর জাতি আবার ডুবে গিয়েছিল নৈরাশ্যের এক অতলান্ত কৃষ্ণবিবরে, আর তার বুকের ভিতর থেকে আবারও গুমরে গুমরে উঠছিল আলোর আকাক্সক্ষা। আবারও আপামর বাঙালির প্রাণ আকুল হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল আরেকজন নেতাকে, যিনি তাদের তমসাবৃত জীবনকে আবার আলোকের অভিযাত্রী করে তুলতে পারবেন, জাতির পিতার মতোই।

সমগ্র জাতি যখন শোকে, ভয়ে মুহ্যমান, দুঃশাসনের জগদ্দল পাথর যখন তাদের বুকের ওপর চাপা, তখন কেউই তাদের সেই প্রার্থনাকে পূর্ণ করতে পারেনি, সেই অনির্দেশ্য ভবিতব্যের তমসাবৃত প্রহেলিকায় বঙ্গবন্ধুর রক্তই জবাব দিল সে প্রার্থনার। বঙ্গবন্ধুর ঔরসজাত কন্যা, আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা, আপনি এসে জাতির হাল ধরলেন। পিতার প্রতিষ্ঠিত দল আওয়ামী লীগের প্রতীক ‘নৌকা’ আরো একবার সার্থকনামা হয়ে উঠল, আরো একবার জাতিকে পৌঁছে দিল অকূল থেকেকূলে। সবাই দেখতে পেল, স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলটির নৌকায় আবারও যাত্রী হয়েছে এদেশের লাখো কোটি নাঙ্গা ভুখা, লাঞ্ছিত নিপীড়িত মানুষ, আর আরো একবার “সেই নাওয়েতে হাল ধরেছে গোপালগঞ্জের মাঝি”, যাঁর নাম শেখ হাসিনা, প্রভাতসূর্যের মতো যাঁর “আঁধার বিদার উদার অভ্যুদয়”।

প্রিয় নেত্রী, জাতির পিতার মতোইআকাশচুম্বী আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাজারোবাধাবিপত্তি অতিক্রম করেআপনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে। জনকল্যাণমুখী কাজের মধ্যে দিয়ে আপনি গণমানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলে ঠাঁই করে নিয়েছেন।আপনি আমাদের আত্মার আত্মীয়, আস্থার প্রতীক, উন্নয়নের উৎসমুখ। এদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে বিশিষ্টজন, প্রত্যেকেই মনে করেন, বাংলাদেশে এমুহূর্তে আপনার নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

বিংশ শতাব্দীর শেষ দু’দশক আর একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দু’দশক জুড়ে আপনার সংগ্রাম আর নেতৃত্বের যে সোনাঝরা ইতিহাস রচিত হয়েছে, তা কালের প্রেক্ষাপটে মহাকাব্যিক। আপনি আজ বিশে^র বিস্ময়, ’নিউ স্টার অব দা ইস্ট’, একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, সংগঠক ও মনস্বী লেখক।

আপনি বলেছিলেন, ‘আমার রাজনীতি হচ্ছে জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা। আমরা তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করতে চাই, যেখানে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণ এক মানবেতর জীবনযাপন করে।’ আপনার সে-কথা আপনি রেখেছেন। পিতার মতোই দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সার্বক্ষণিক চিন্তা আপনার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি দরিদ্র মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্যআশ্রয়ণ প্রকল্প, আদর্শ গ্রাম, গৃহায়ণ তহবিল, ঘরে ফেরা কর্মসূচি ইত্যাদি বহু কল্যাণমুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ দেশে আপনিই সর্বপ্রথম চালু করেছেন বয়স্কভাতা, দুঃস্থ, স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের ভাতা আর বিধবা ভাতা।

বিশ্ব নেতৃত্বের প্রসারিত ক্ষেত্রেও আপনি আজ সুউচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। বিশ্ব জলবায়ু নিয়ে সাহসী ও সময়োপযোগী বক্তব্য দিয়ে আপনি সকলের সপ্রশংস নজর কেড়েছেন। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে বিশেষ জাতিসংঘ পুরস্কার অর্জন করেছেন। শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য আপনার বাংলাদেশকে এ পুরস্কার দিয়েছিল জাতিসংঘ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশই এ পুরস্কার পেয়েছে। এখন আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে এসডিজি অর্জনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে দৃঢ নিশ্চিত পায়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।

একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে এখন আপনি ২১০০ সালের বাংলাদেশ নির্মাণের কথা ভেবে ‘ডেল্টা প্ল্যান’ মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। সেই লক্ষে সুদুরপ্রসারী সুফল দিতে পারে এমন বৃহৎ পরিধির প্রকল্প গ্রহণে ্আপনার সাহসিকতা আপনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার আকাঙ্খাকে প্রতিফলিত করে। সেই অনির্বাণ সাহসের রূপায়ণ ঘটেছে পদ্মাবহুমুখি সেতু প্রকল্পের সার্থক বাস্তবায়নে, যা আপনার এক অদম্য মহাকাব্যিক সাফল্যের প্রতীক।

আপনার হাত ধরেই জাতির গর্ব ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের মাধ্যমেউন্নত দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে মহাকাশেও চলছে দেশের জয়যাত্রা। আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বহির্বিশ্বে সমীহ আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। আপনার আমলে বিদ্যুৎ সেক্টরে আজ আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানকল্পে দ্রুত এগিয়ে চলেছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ অচিরেই বাস্তবায়িত হবে।আপনার সফল দিকনির্দেশনায় নির্মাণকাজ সুসম্পন্ন হয়ে উদ্বোধনেরঅপেক্ষায় ঢাকায় মেট্রো রেল ও চট্টগ্রামে কর্ণফুলি টানেল। আপনার কর্মকাণ্ড একের পর এক পাচ্ছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আপনি আজ ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বিশ^মানবতার জননী হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের মুদ্রামান আজ ভারতীয় মুদ্রাকে ছুঁই ছুঁই করছে।

বিশ্বমানবতার জননী, মহান জননেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আজ ৭৫তম জন্মবার্ষিকী।আপনার অতুল কৃতিত্বের কথা শতমুখে বলেও শেষ করা যাবে না। জীবনের এই পরিণত বয়সে পৌঁছেও আপনার অবিশ্রান্ত জনকল্যাণকামী কর্মযজ্ঞের বিরাম নেই।আমরা আপনার সুস্থ, নীরোগ, কর্মময় শতায়ু কামনা করি।

লেখক: কলামিস্ট, গবেষক, শিক্ষাবিদ, ফোকলোরিস্ট, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ও সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Related posts

Leave a Comment