শারীরিক সম্পর্কে বাধা দেওয়ায় মা-মেয়েকে গলাকেটে হত্যা করেন আনোয়ার

মুক্তবার্তা ডেস্কঃ জামালপুরের মেলান্দহে মা-মেয়ে জোড়া খুনের মামলার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এ ঘটনায় একমাত্র আসামি আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধা দেয়ায় মা ও মেয়েকে গলাকেটে হত্যা করেছেন আনোয়ার।

রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানায় সিআইডি।

সিআইডি জানায়, গত ১ জানুয়ারি জামালপুরের মেলান্দহ থানার গোবিন্দপুর এলাকার একটি ঘর থেকে মা মেয়ের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন- মেলান্দহ থানার গোবিন্দপুর গ্রামের মৃত আকমল চৌধুরীর স্ত্রী মোছা. জয়ফুল বেগম এবং তার মেয়ে আকলিমা আক্তার স্বপ্না।

সিআইডির সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জয়ফুল বেগমের ওমান প্রবাসী দুই ছেলে- মো. হাসান চৌধুরী ও মো. খালেক চৌধুরী ওমান থেকে ফোন করে তাদের মা-বোনকে না পেয়ে তাদের মামা মো. মানিক মিয়াকে তাদের বাড়িতে পাঠান। তাদের মামা বাড়ি যেয়ে দরজা- জানালা বন্ধ পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে আলাদা দুটি কক্ষে তার বোন ও ভাগ্নির গলাকাটা লাশ দেখতে পান। এ ঘটনায় নিহত জয়ফুল বেগমের ভাই মো. মানিক মিয়া মেলান্দহ থানায় গত ২ জানুয়ারি একটি মামলা করেন। মেলান্দহ থানার মামলা নম্বর-০১। ধারা- ৩০২/৩৪ পেনাল কোড-১৮৬০।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মুক্তাধর বলেন, জামালপুরের মেলান্দহে সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস ডাবল মার্ডার মামলার রহস্য উন্মোচন ও একমাত্র আসামিকে আনোয়ার হোসেনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি।

মুক্তাধর জানান, প্রায় আট বছর আগে যশোর এলাকায় স্বপ্নার বিয়ে হয়। এরকিছুদিন তাদের তার স্বামীর সাথে তালাক হয়ে যায়। পাঁচ বছর আগে স্বপ্না নারায়ণগঞ্জের একটি বিউটি পার্লারে কাজ করতেন। তখন স্বপ্নার সঙ্গে মো. আনোয়ার হোসেনের পরিচয় হয়। ওই সূত্র ধরে দুইজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে আনোয়ার হোসেন স্বপ্নার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু স্বপ্নার জোড়ালো অসম্মতির কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন ধরে আনোয়ার হোসেন স্বপ্নার বড় ভাই মো. জহুরুল চৌধুরীর বাড়িতে বিল্ডিং নির্মাণের কাজ করে আসছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার দিন স্বপ্নাদের বাসায় গল্প করতে যায় আনোয়ার। এক পর্যায়ে স্বপ্না আনোয়ারকে ডেকে বলে যে, তার ও তার মায়ের প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা করছে। সে যেন কাজ শেষ করে তাদের জন্য ওষুধ নিয়ে আসে। কাজ শেষে সন্ধ্যার পর আনোয়ার তাদের বাড়ি যেয়ে স্বপ্নার সাথে গল্প করতে থাকে। একপর্যায়ে স্বপ্না ও তার মা আনোয়ারের কাছে ওষুধ চাইলে- আনোয়ার অসৎ উদ্দেশে সাথে নিয়ে আসা ঘুমের ওষুধকে ব্যাথার ওষুধ হিসেবে প্রত্যেককে তিনটি করে ট্যাবলেট দেয়। স্বপ্না ও তার মা আনোয়ারের কথায় বিশ্বাস করে ওষুধ খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে একই রুমে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন দীর্ঘদিন ধরে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা আনোয়ার হোসেন তার অবৈধ যৌন কামনা চরিতার্থ করতে অচেতন স্বপ্নাকে কোলে করে তার মায়ের রুম থেকে পাশের রুমে নিয়ে যাচ্ছিল। এসময়ে স্বপ্না জেগে যায়। তখন আনোয়ার জোর করে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করার চেষ্টা করলে স্বপ্না প্রাণপণে বাধা দেয়। এতে আনোয়ার হোসেন রেগে গিয়ে ঘরে থাকা গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত বটি দিয়ে স্বপ্না এবং স্বপ্নার মা জয়ফুল বেগমকে গলায় কুপিয়ে হত্যা করে। পরে দরজা বন্ধ করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে মুক্তাধর বলেন, মা এবং মেয়েকে নিজ ঘরের মধ্যে নৃশংসভাবে গলাকেটে হত্যা করে লাশ ঘরের মধ্যে রেখে ঘরের বাহিরে জিআই তার দিয়ে আটকিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। তখন সিআইডির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশনায় সিআইডির এলআইসি শাখা ছায়া তদন্ত শুরু করে। ওই হত্যার ঘটনাটি কেন এবং কিভাবে সংগঠিত হয়েছে, ঘটনায় কে বা কারা জড়িত, কারো সাথে পারিবারিক বা ব্যবসায়িক পূর্ব কোনো বিরোধ ছিল কী না ইত্যাদি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর নিহতদের পরিবার, ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকার বিভিন্ন উৎস থেকে সরেজমিনে সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে তথ্য ও উপাত্ত বিচার বিশ্লেষণ করে মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে ঘটনার যোগসূত্র পাওয়া যায়। এরপর তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায় সিআইডি। অবশেষে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার গোদনাইল এলাকা থেকে শনিবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির বিশেষ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমান, খায়রুল আমিন, সহকারী পুলিশ সুপার শাহজাহান খান এবং মো. রাকিবুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।

Related posts

Leave a Comment