মুজিবনগর দিবস বাঙালি জাতির চেতনায়

ড. মো: শাহিনুর রহমান

বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ সম্মিলিতভাবে একটি সার্বভৌম জাতিগঠনের দীর্ঘলালিত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষে সাংবিধানিকভাবে ন্যায্য এবং যৌক্তিকভাবে সম্ভবপর সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়ার ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল, ‘মুজিবনগর সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমাদের ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার জন্য কিছু মহলের বিভ্রান্তিকর ও গ্লানিময় অপচেষ্টার কালিমা অপনোদনের জন্য প্রতিবছর এই দিনে মুজিবনগর দিবসকে যথাযথ সম্মানসহকারে পালন করা প্রয়োজন। স্বাধীন বাংলাদেশের আপামর জনগণের উচিত দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা কেননা তারা আন্তরিক ভালবাসা, জাতীয় চেতনার প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাসহকারে অবিচল দৃঢ়তার সাথে নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে মুক্তির বন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন। ১৯৭০ সালের শেষভাগে অনুষ্ঠিত গণপরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস বিজয়ে নেতৃত্ব দেন এবং এককভাবে সরকার গঠনে আওয়ামী লীগের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন। বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আইনগত সুযোগ তৈরি হয়ে যাবে সেই দুর্ভাবনায় পাকিস্তানের জান্তা সরকার আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয়নি। উপরন্তু চাপিয়ে দিয়েছে নৃশংস নির্মম হত্যাযজ্ঞ। সেইসাথে কারান্তরীণ করেছে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু জনগণের সমর্থন লাভ করা তাঁর সকল রাজনৈতিক সহকর্মী হাল ছেড়ে দেননি। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করে গণপরিষদের সকল সদস্য দেশের নাগরিকদের প্রতি তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। সেই কারণে মুজিবনগর দিবস (১৭ এপ্রিল) বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য উপলক্ষ। ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচিত হবার পর, ১৯৭১ সালের ওই তারিখে কুষ্টিয়া জেলার প্রাক্তন মহকুমা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন মুজিবনগর সরকারের সদর দফতরে পরিণত হয়। শপথ গ্রহণ এবং একটি নতুন জাতির জন্ম উদযাপন করতে সেদিন সেখানে শত শত বিদেশী সাংবাদিক জড়ো হয়েছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের সময়ে বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও তার সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সম্পূর্ণরূপে কার্যকর ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী হন অর্থমন্ত্রী, এম. কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হন এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ (বিশ্বাস ঘাতক) পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রকের দায়িত্ব পান। সাবেক কর্নেল এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানীকে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মনোনীত করা হয়। বেসামরিক প্রশাসন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, সর্বাত্মক যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য সমরাস্ত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং সেসব ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ত্বরিত ও কুশলী কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য বিদেশী সমর্থন আদায়, তদুপরি যুদ্ধাবস্থার আশাবৈর, নৃশংস এবং কঠোর সময়কে উৎরাতে সুচিন্তিত ও প্রায়োগিক দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করার জন্য অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের প্রয়োজন। উত্তম যোগাযোগ এবং সুসমন্বয়ের মাধ্যমে যুদ্ধে নিয়োজিত হাজার হাজার যোদ্ধার মনোবলকে এই সরকার উত্তুঙ্গ অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমাদের সর্বোচ্চ নেতা যখন উপস্থিত ছিলেন না, তখন তাঁর সংগ্রামী সহকর্মীরা ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার পর আরও আট মাস আমাদের দেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন তারা এবং এর মাধ্যমে মুক্তিসংগ্রামের ভিত্তিস্বরূপ জাতীয় চেতনার অটুট বন্ধন নিশ্চিত করেন। তাদের সাহসী ও উদ্যমশীল প্রণোদনায় বলীয়ান হয়ে সকল মুক্তিযোদ্ধা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে লড়াই চালিয়ে গেছেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি তারা নিরন্তর করে গেছেন, তা হলো, আমাদের জাতির পিতাকে সকলের মনের মণিকোঠায় স্থায়ী আসনে বসিয়ে দিয়েছিলেন। ১৭ এপ্রিল গঠিত সরকারটি মুক্তির লক্ষে পরিচালিত যুদ্ধের প্রচেষ্টাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য সংহতি দান করেছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের জনগণ জাতীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ অনুভব করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে তাদের দেশের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে এদেশের গণমানসকে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি আদায়ের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ সংগ্রাম অর্থাৎ স্বাধীনতা যুদ্ধের অভিমুখি করে তুলতে সক্ষম হবে, মুজিবনগর সরকার গঠন তারই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১-এ যা কিছু ঘটেছিল, তার ফলে এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস চিরতরে বদলে গেছে, সাংবিধানিক বৈধতা এবং সামরিক সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে জাতির প্রধান নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্থান নিশ্চিত হয়েছে। ইতপূর্বে নিজের পিতা ও পিতামহের অহিংস চারিত্র্য ধারণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সশস্ত্র বিপ্লব বা রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দেননি। ফলস্বরূপ, তাঁকে তার বন্ধুদের সতর্ক করতে হয়েছিল যে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা যদি আক্রমণ শুরু করে, তবে একটি দীর্ঘ এবং ভয়ঙ্কর যুদ্ধাবস্থা অনিবার্য হয়ে উঠবে। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে কারারুদ্ধ হওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তার সহযোগীদের সহিংস প্রতিরোধের পন্থা অবলম্বন করতে প্ররোচিত করেন। এতে প্রমাণিত হয় যে নিজে কারারুদ্ধ হলে কী করতে হবে তার নির্দেশনা তিনি তার সহযোগীদের দিয়েছিলেন।
ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সক্রিয় হওয়ার সাথে সাথে বাঙালি জাতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে শীর্ষ নেতাদের ঢাকা ত্যাগ করে অন্যত্র সংগঠিত হবার একটি বার্তা দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, এই মহান নেতার বিশ্বস্ত ও দক্ষ সহকর্মীদের পক্ষে একটি সরকার গঠনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে মুজিবনগরকে নির্বাচন করা ছিল সাংবিধানিকভাবে সঠিক, বিচক্ষণ এবং বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করেছিল। যদি কোন কর্তৃত্বশীল সংগঠন না থাকত, তাহলে গেরিলা আন্দোলনগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনও কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অনুপস্থিতিতে সেগুলি যে সারা দেশে বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে পড়ত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বৈধতার অনুপস্থিতিই এর বিপদের উৎস। এইভাবে, মুজিবনগর সরকারের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেবলমাত্র একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের মাত্রা দান করত, যা পাকিস্তানিদের সন্তুষ্টি এবং সামরিক আক্রমণের অধীনে বাঙালি জনগণের শঙ্কার আধার হয়ে উঠত। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাদের সহকর্মীদের সাথে যে বক্তব্য রাখেন তাতে তারা তাদের উদ্দেশ্য ও তৎসংশ্লিষ্ট পদক্ষেপকে স্পষ্ট করেন এবং বলেন বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দেশের জনগণের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষে দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। বৈধ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে মুজিবনগর সরকারের বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মেনে নিতে বাধ্য হয়। নেতৃত্ব জনগণের সমর্থন পাবার দরুণ জাতির মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকে বিদ্রোহ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তদুপরি, সামরিক বাহিনীর ভুল (বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার উপর পাশবিক জিঘাংসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া) মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যুক্তিটিকে প্রাবল্য দিয়েছিল। নারী ও নিরস্ত্র নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি নৃশংসতা প্রকারান্তরে স্বৈরশাসনকে অস্থিতিশীল করার জন্য মুজিবনগর সরকারের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করেছিল। নিকটতম প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের তাৎক্ষণিক ও আন্তরিক সমর্থন এবং ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ বাঙালির ভারতে অভিগমণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের গুরুত্ব এবং বৈধতা নিঃসংশয়ে তুলে ধরেছিল। মুজিবনগর সরকার সমগ্র বিশ্বের সামনে প্রবলভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিল যে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্টের প্রতিষ্ঠাই একমাত্র কার্যকর বিকল্প। এই দায়িত্বটি নিঃসন্দেহে ছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের, যা বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানি দূতাবাসগুলিতে বাঙালি কূটনীতিকদের দ্বারা আনুগত্য ঘোষণার মাধ্যমে ত্বরিৎ তৈরি হয়ে গিয়েছিল এবং সুচারুভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারণা চালাতে সক্ষম হয়েছিল। এই ঘটনা বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক মতামতকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করেছিল। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্লেষক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মতে, মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমতকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠান এবং পরবর্তীকালে যেসব বক্তব্য ও ঘোষণার দেন সেজন্য সাধুবাদ অর্জন করেন। মুজিবনগর সরকারের পথনির্দেশক ধারনাগুলি সার্বজনীন মানবাধিকার নীতি এবং প্রশাসনিক বিধি মেনে রচিত হয়েছিল এবং সেগুলি সাধারণভাবে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মান ও চুক্তি অনুসারে গণতান্ত্রিক ছিল। মোটকথা, মুজিবনগর সরকারের প্রতিষ্ঠা গণতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করে একটি নতুন জাতির উত্থানের সংকেত দেয়। বঙ্গবন্ধুর সর্বোচ্চ নেতৃত্বে তাঁর সমসাময়িক নেতৃবৃন্দ এতদঅঞ্চলের বাংলাভাষী জনগণকে একত্রিত করে জাতিগঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে সমগ্র জাতির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। যিনি মুজিবনগর সরকার গঠন অনুষ্ঠান উদযাপনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলাধীন মেহেরপুর সাব-ডিভিশনের সাব-ডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বীর বিক্রমের মতে, মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল “আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি মাইলফলক।”
তিনি দাবি করেন যে এই ঘটনা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে যৌক্তিকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করে। “আমি নিশ্চিত যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্য ইতিহাস আবিষ্কারের জন্য ইতিহাসের শিকড়ে ফিরে আসবে। সত্যের জয় হবে।” তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপনের সাম্প্রতিক প্রবণতার বিপক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা জোর দিয়ে বলেন। সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনে মুজিবনগর মন্ত্রিসভার সদস্যদের গার্ড অব অনারের দায়িত্বে থাকা জনাব মাহবুবউদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রমের অনুভবও একই রকম। সেই সময় জনাব মাহবুব ঝিনাইদহে সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের দ্বারা আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস বিকৃত করার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার কড়া সমালোচনা করেছেন তিনি। তার মতে, তথাকথিত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় রত নাগরিকদের এক অংশের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের চেতনা ধারণ এবং এর সঠিক বাস্তবায়নের জন্য সুদৃঢ় প্রত্যয়, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমের দৃঢ় বোধের প্রয়োজন। যাই হোক, ১৯৭১ সালের মতই আত্মোত্সর্গ নিশ্চিত করা এবং একযোগে কাজ করা আজকের দিনে প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রয়োজন। পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানী থেকে দূরে একটি প্রত্যন্ত এলাকায় গঠিত হলেও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং কূটনৈতিক অন্তঃর্দৃষ্টির সুপরিকল্পিত প্রয়োগের মাধ্যমে মুজিবনগর সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক পরিচালনা এবং এর পক্ষে বিদেশে জনমত প্রতিষ্ঠার জন্য সাফল্যের সাথে কাজ করেছিল। এই সরকারের কর্মকাণ্ড সুপরিকল্পিত এবং সংগঠিত ছিল যার ফলস্বরূপ সেই সময় বিশ্বব্যাপী সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। মুজিবনগর সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক শক্তির জন্য সর্বপ্রকারে প্রতিরোধাত্মক ছিল। মুজিবনগর সরকারের নেয়া সুপরিকল্পিত পদক্ষেপসমূহের কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের জয়লাভ ঘটে। এই সরকারের বিচক্ষণতা, দেশপ্রেম, ও কর্মকুশলতার প্রভাব পড়েছে বঙ্গবন্ধুতনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ওপর। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে একটি আত্মনির্ভর, সুখী, সমৃদ্ধিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এবং ইত্যবসরে দেশকে দ্রুত উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী উপস্থাপনে সমর্থ হয়েছেন।
এভাবেই মুজিবনগর দিবস বাঙালি জাতির চেতনায় চিরদিন জাগরুক থাক সেই কামনা করি।

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু

লেখক: কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, ফোকলোরিস্ট, অধ্যাপক ইংরেজি বিভাগ এবং সাবেক উপ-উপাচার্য , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ

Related posts

Leave a Comment