জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার নিয়ে প্রথমবার রেজ্যুলেশন গৃহীত

মুক্তবার্তা ডেস্কঃ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বুধবার প্রথমবারের মতো “মিয়ানমারের পরিস্থিতি” বিষয়ক একটি রেজ্যুলেশন গৃহীত হলো। এতে মিয়ানমারের বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জরুরি অবস্থা, বন্দী মুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

রেজ্যুলেশনটির ওপর ভোট আহ্বান করা হলে তা ১২-০ ভোটে অনুমোদিত হয়। ভোটাভুটি পর্বে এই প্রস্তাবনার বিপক্ষে কোনো সদস্য ভোট অথবা ভেটো প্রদান করেনি। তবে চীন, ভারত ও রাশিয়া ভোটদানে বিরত ছিল।

ভোটদান শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, মেক্সিকো, গ্যাবন এবং নরওয়ে তাদের বক্তব্যে রেজ্যুলেশনটিতে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রশংসা করে এই সমস্যা সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের জোরালো ভূমিকার দাবি জানান।

যুক্তরাষ্ট্র তার বক্তব্যে রেজ্যুলেশনটি উত্থাপন করার জন্য যুক্তরাজ্যকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। বলা বাহুল্য, এই রেজ্যুলেশনটি রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের প্রতি জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর অঙ্গটির শক্তিশালি সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটসহ অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে গৃহীত রেজ্যুলেশনটি রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আরো সুসংহত করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়ে ২০১৭ সালে ৮ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাসহ এ পর্যন্ত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে তাদের অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করেন এবং শুরু থেকেই তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবসনের নিমিত্তে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে জোরালো দাবি উত্থাপন করে আসছেন।

এই প্রস্তাবনা অনুমোদিত হওয়ার ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদের নিয়মিত কার্যকলাপের অংশ হয়ে গেল। একই সাথে এটি রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের এতদসংক্রান্ত অব্যাহত প্রচেষ্টাকে আরো শক্তিশালি ও ত্বরান্বিত করবে।

রেজ্যুলেশনটিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, নিরাপত্তা ও মানবিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করা হয়। পরিষদ রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিমিত্তে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানায়। মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা যে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ বাসভূমি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলবে, সে বিষয়টি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরা হয়। এছাড়া, এ সমস্যার সমাধানে আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ২০২১ সালে গৃহীত পাঁচ দফা ঐকমত্যের দ্রুত ও পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় এবং এর বাস্তবায়নে জাতিসংঘের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হবে কি না সে বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব এবং মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতকে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রতিবেদন পেশ করার জন্য অনুরোধ করা হয়।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন রেজ্যুলেশনটিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী স্থায়ী ও অস্থায়ী বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের সাথে প্রয়োজনীয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যাতে রেজ্যুলেশনে অন্তর্ভুক্ত হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

উল্লেখ্য, রেজ্যুলেশনটির পেন হোল্ডার (মূল স্পন্সর) পরিষদের অন্যতম স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য। বিগত তিন মাস ধরে রেজ্যুলেশনটির নেগোসিয়েশন শেষে ২১ ডিসেম্বর এটি নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের চলতি মাসের সভাপতি ভারত এবং তাদের সভাপতি থাকাকালীন সময়েই রেজ্যুলেশনটি নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত হলো। এর ফলে মনে করা হচ্ছে যে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টায় সফল হলো বাংলাদেশ।

এদিকে, এই রেজ্যুলেশন পাসের ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২৬৬৯ নম্বরের রেজ্যুলেশনটি গৃহীত হবার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি জে ব্লিংকেন এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, মিয়ানমারের সংকট সমাধানের পথে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। মিয়ানমারের বেসামরিক লোকজনের ওপর সামরিক জান্তার দমন-পীড়ন অবসানের পথও সুগম করবে।

একইসাথে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জোরদার একটি বার্তা দিলো যে, সারা মিয়ানমারে নিরীহ জনসাধারণের বিরুদ্ধে আর কোনো দমন-পীড়ন চালাতে পাারবে না সামরিক জান্তা। একইসাথে ইতোমধ্যেই যাদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মুক্তি এবং মানবাধিকার কর্মীদের গতিবিধি অবাধ, ধর্ম ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, জনগণের ইচ্ছা ও গণতান্ত্রিক আগ্রহের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে সামরিক জান্তাকে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন যে, তবে এখানেই আমাদের থেমে থাকলে চলবে না। মিয়ানমারের সংকট মোকাবিলায় আরো অনেক কিছু করার আছে। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনে সিকিউরিটি কাউন্সিলকে সক্রিয় থাকতে হবে। সামরিক জান্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে সিকিউরিটি কাউন্সিলকে।

Related posts

Leave a Comment