জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৭ মার্চের ভাষণ: একটি মূল্যায়ন

প্রফেসর ড. মো. শাহিনুর রহমান

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার, বাঙালির মৃত্যুহীন অনাপোষ সংগ্রামী মানসিকতার সর্বোজ্জ্বল প্রতিভূ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে আপামর বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার দুর্মর আকাঙ্খা জাগিয়ে তোলার পর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি জান্তা জান্তব আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত সাধারণ বাঙালির ওপর; সঙ্গে সঙ্গে চক্রান্তেÍর ষোলকলা পূর্ণ করতে তারা গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুকে। এর অব্যবহিত পূর্বে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের এই নির্ণায়ক মুহূর্তের পরই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আন্দোলন পরিবর্তিত হয় এক সর্বাত্মক সশস্ত্র সংগ্রামে। শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই এই মহাসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর জ্বালিয়ে দেয়া চেতনার মশাল মুক্তিযুদ্ধকে পথ দেখিয়ে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখনও পাকিস্তানি কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গুনেছেন। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি জান্তা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন তাঁর সাধের স্বাধীন সোনার বাংলাদেশে। মুজিব শতবর্ষের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এক অনন্য মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীন দেশের যেস্থানে প্রথম পা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু, সেই তেজগাঁও পুরাতন বিমান বন্দও প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে ‘মুজিববর্ষ’- এর ক্ষণগণনা।

ফাগুণের ফুলদলে উদগীর্ণ রক্তরাগ হৃদয়ে বসনে ধারণ করে প্রতিবছর মার্চ মাস আসে বাংলায়। মনের জানালায় ছোঁয়া দিয়ে বার বার বলে যায় ১৯৭১-এর সেই অগ্নিঝরা মার্চের কথা যে মাসে বাংলার সাত কোটি মানুষ অস্তিত্বের ক্ষমাহীন সংগ্রামে মরণপণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেই সংগ্রামে তাঁদেরকে প্রণোদিত করেছিলেন এক শালপ্রাংশু বিশালহৃদয় বাঙালি যিনি হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে সর্বত্র স্বীকৃত-তিনি আমাদের মুক্তিদাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর অগ্নিস্রাবী কণ্ঠনিঃসৃত ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ মুক্তির সংগ্রামের অনুপ্রেরণা, বাংলার স্বাধীনতার সনদ, আমাদের লাল-সবুজের পতাকা, স্বাধীন জাতিসত্ত্বার অহংকার, বিশ্বব্যাপী বাঙালির জন্য সর্বকালের দিক-নির্দেশনা এবং সর্বোপরি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অন্যতম দলিল। এই মহাকাব্যিক ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানি জান্তার পাশবিক নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণা বাঙালির ভাগ্যাকাশে উদিত করে স্বাধীনতার অম্লান সূর্যকে। মহাসংগ্রামের মহানায়ক জাতির পিতার জন্মও হয়েছিল শতবছর আগে এই মার্চ মাসেই। এবছর সমগ্র জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় নানা আয়োজনে পালন করছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ।

বাংলার আকাশে স্বাধীনতার রক্তরঙিন সূর্যোদয়ের অনুঘটক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিবস এবং মুজিববর্ষে সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা।

১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের যে দেশটি জন্ম নিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল তারই মূল ভিত্তি ও নিখুত strategy । ৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি ভাষণ নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির দীর্ঘ নির্মম ইতিহাসের উন্মোচন এবং নতুন ইতিহাস নির্মাণের দিক নির্দেশনা। এ যেন আইরিশ কবি W.B. Yeats এর ভাষায় “O body swayed to music, O brightening glance” এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন বক্তাকে তাঁর দেয়া বক্তব্য থেকে কিছুতেই আলাদা করা যায়না। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বেলায় ঠিক এমনটিই ঘটেছে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের স্বপ্ন সাধনার এবং তার বাস্তবায়নের কি নেই এর মধ্যে? ‘ভায়েরা আমার’- বাঙালির এমন ঐতিহ্যিক আদরের সম্বোধনের পর আমাদের এই জাতির নির্যাতিত-নিপীড়িত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত ও নাতিদীর্ঘ ভূমিকায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে জাতির অবিসংবাদী নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জলদ গভীর কন্ঠে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রত্যাশায়, পাকিস্তানী শাসকদের সঙ্গে সংগ্রাম ও সংঘাতের একটি কালানুক্রমিক বিবরণ, চলমান ঘটনার দুঃসহ একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনার পর অসহযোগ আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা উপস্থাপন করে একটি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র গড়ার অঙ্গিকারসহ সকল বিষয়ের তীক্ষè উপস্থাপনায় ভাস্বর এই ভাষণ দান করেন। মহাকাব্যিক ও কালোত্তীর্ণ ৭ মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের এক বহুমাত্রিক অমূল্য মাস্টারপিস প্রতিম দলিল। এই ভাষণের গুরুত্ব এখানেই যে, এর শব্দ চয়ন, সামগ্রিক গাঁথুনি এবং তাতে মানবিকতার স্পর্শ ও যুক্তির বিন্যাসের অনন্যতায় এটি তুলনারহিত হয়ে উঠেছে। আমাদের এই উপমহাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মত উদ্দীপক, ন্যয়নিষ্ঠ যুগের পর যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হওয়ার মতো গুণসম্পন্ন ভাষণ আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভাষণটির নানা স্তর পরিক্রমায় বাঙালির মুক্তির কথা বারংবার উচ্চারণ করে মাস্টারস্ট্রোকটি বঙ্গবন্ধু দিলেন এই ভাষায়, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই প্রকৃতপক্ষে স্বাধীণতার ঘোষণা। ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় ২৫ মার্চ প্রসঙ্গে বলেন:
“আমি যখন পিলখানার সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম না তখন আমি চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগ করে বললাম, “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। তোমরা বাংলার সব জায়গায় ওয়্যারলেসে এ খবর দিয়ে দাও। পুলিশ হোক, সৈন্যবাহিনী হোক, আওয়ামী লীগ হোক, ছাত্র হোক যে যেখানে আছে – পশ্চিমাদের বাংলা থেকে খতম না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাও। বাংলাদেশ স্বাধীন।”

বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতির দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ৭ মার্চ যখন ডায়াসে দাঁড়ালেন, হাজার বছর ধরে ইতিহাস রচনার প্রক্রিয়ার এক ঐতিহাসিক মুহুর্তকে বাঙময় করে তুললেন। মাত্র ১৯ মিনিট তিনি ভাষণ দিলেন, প্রতিটি বিষয় একটি একটি করে কোন কোন শব্দের উচ্চারণ বারংবার করে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিলেন। এরই ফলে বাঙালির মুক্তির বিষয়টি বারংবার উচ্চারিত হয়ে সমবেত দশ লক্ষাধিক বাঙালিকে জীবনপণ বাজি রেখে লড়াই করে মুক্তি অর্জনে লড়াকু যোদ্ধায় পরিণত করলো। মুক্তির লড়াইয়ের এই বীজমন্ত্র রমনা-রেসকোর্সের ময়দানে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে আছড়ে পড়লো বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ এবং প্রান্তিক এলাকায়। একটি ভাষণ যে গোটা জাতিকে এতটা একাত্ম করতে পারে তার নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুর এই অনন্য সাধারণ ভাষণের জন্যই বিশ্ববিখ্যাত Newsweek পত্রিকা তাঁর বক্তৃতার সামগ্রিক যৌক্তিকতার ভিত্তিতেই বঙ্গবন্ধুকে ‘Poet of politics’ হিসেবে আখ্যায়িত করে, যা পত্রিকাটি ৫ এপ্রিল, ১৯৭১ সংখ্যায় প্রকাশ করে।
পত্রিকায় বলা হয়:

“Mujib can attract a crowd of million people to his rallies and hold them spellbound with great rolling waves of emotional rhetoric. He is a poet of politics. So his style may be just what was needed to unite all the classes and ideologies of the region.”(http://m.theindependentbd.com/arcprint/details/56453/2016-08-19http:)

এটি একটি গভীর পর্যবেক্ষণ। Bacon, Lamb, Dr. Johnson, Newman, Matthew Arnold, Carlyle, Ruskin, Walter Pater প্রমূখদের নিজস্ব শৈলীর কারণে আলাদাভাবে চেনা যায়। বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় এই শৈলীর কারণেই অলৌকিক এক ব্যঞ্জনায় তাঁর শ্রোতাদের ৭১ সালে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল, বর্তমানেও করছে এবং অনাগত যুগে যুগে করে যাবে। Coleridge এর The Ancient Mariner কবিতার বৃদ্ধ নাবিক যেমন অতিথিকে তার চোখের দৃষ্টি দিয়ে মোহাবিষ্ট করেছিল। এখানে বঙ্গবন্ধু তাঁর শৈলী দিয়ে শত কোটি মানুষকে আবিষ্ট করেছেন। Newsweek-এর প্রতিবেদক সঠিকভাবেই বঙ্গবন্ধুর বিশেষ এই শৈলীকে আবিষ্কার করেছেন। এটি সেই শৈলী যার মাধ্যমে তিনি সকল শ্রেণীর পেশা ও আদর্শের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি গণমানুষের আস্থা ও নির্ভরশীলতা এতটাই বেশি ছিল যে তাঁর কথা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করত। তিনি নিজের ভাগ্যকে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের সাথে একাকার করে নিয়েছিলেন। সে জন্যই সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর গভীর দরদ ও মমতা তাঁর ভাষণে বাঙময় হয়ে উঠত। কবি Wordsworth–এর ভাষায় এ যেন তাঁর শব্দমালা ‘spontaneous overflow of powerful feelings’। এ কারণেই যেন তিনি ‘Poet of politics’।
১৯৯৪ সালের ২০ ডিসেম্বর London Obsever পত্রিকার বিশিষ্ট সাংবাদিক Cyril Dunn মন্তব্য করেন:
“In the thousand year history of Bengal, Sheikh Mujib is her only leader who has, in terms of blood, race, language, culture and birth, been a full blooded Bengali. His physical stature was immense. His voice was redolent of thunder. His charisma worked magic on people. The courage and charm that flowed from him made him a unique superman in these times.” (Embassy of Bangladesh, Ankara, Turkey – Father of the Nation www.bangladootankara.org.tr › menu)

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে লন্ডন থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যার শিরোনাম “We Shall Fight on the Beaches: The Speeches That Inspired History’ লিখেছেন অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের প্রথিতযশা অধ্যাপক Dr. Jacob F. Field. বইটি বিশ্বের যুগান্তকারী স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাষণের একটি সংকলন, যে ভাষণগুলি আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাগ্য নির্মাণ করেছে। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ যা কার্যতঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, সেটি গত আড়াই হাজার বছরের পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে প্রেরণাদায়ক ভাষণ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরবর্তী ফলাফল সম্বন্ধেও Dr. Field বলেন:

“The Consequences Mujiburs exhortation for a mass uprising led to swift, violent repercussions. He declared East Pakistan to be independent and the new state was called Bangladesh”.

সংকলনের ভাষণগুলি সালের ক্রমানুসারে সাজানো। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে শুরু করে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৪১ টি ভাষণ আছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটির শিরোনাম দেয়া হয়েছে: The struggle this time is the struggle for independence. (We Shall Fight on the Beaches: The Speeches That Inspired History by Jacob F. Field) ৪১ জনের তালিকাটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সাথে যাঁদের নাম আছে, তাঁদের নাম উল্লেখ করছি:

431 BC Pericles, 326 BC Alexander the Great, 218 BC Hannibal, 48 BC Julius Caesar, 1066 William the Conqueror, 1095 Pope Urban II, 1187 Saladin, 1453 Emperor Constantine XI, 1588 Elizabeth I, 1653 Oliver Cromwell, 1783 George Washington, 1794 Robespierre, 1805 Napoleon Bonaparte, 1860 Garibaldi, 1862 Bismarck, 1865 Abraham Lincoln, 1917 Lloyd George, 1917 Lenin, 1917 Woodrow Wilson, 1936 Emperor Haile Selassie, 1939 Hitler, 1940 Churchill, 1940 de Gaulle, 1941 Roosevelt, 1941 Stalin, 1943 Goebbels, 1945 Ho Chi Minh, 1948 Golda Meir, 1971 Sheikh Mujibur Rahman, 1987 Ronald Reagan

নামগুলো থেকে স্পষ্টতঃই বোঝা যায় যে, বঙ্গবন্ধু নিজে বিশ্বের কোন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং আমাদেরকেও সম্মানের কত উচ্চ আসনে স্থান করে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ একটি জাতির মুক্তির সনদ। ১৯৭১ সালের রেসকোর্স ময়দানে ধ্বনিত বজ্রকন্ঠ জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে সারা বিশ্বের ইতিহাসের অংশ ও সম্পদে পরিণত হয়েছে। হয়েছে ’সীমার মাঝে অসীম’। আফ্রিকার নক্রুমাসহ নেলসন ম্যান্ডেলা অথবা ভিয়েতনামের হোচিমিনকে বঙ্গবন্ধুর মত সাম্প্রদায়িক ও বিশ্বের শোষক শক্তির বিরুদ্ধে এমনভাবে সংগ্রাম করতে হয়নি। সমাবেশ থেকে উচ্চারিত ইটালির Garibaldi’s “To arms, then, all of you!”, চীনের নেতা Chou En-lai” বলেছিলেন “We must hold aloft the great red banner” (We Shall Fight on the Beaches, The Speeches That Inspired History by Jacob F. Field)

আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের দীপ্ত উচ্চারণ, “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। সোভিয়েত রাশিয়ার লেলিন, তুরস্কের আতাতুর্ক, ভারতের মহাত্মা গান্ধী এবং চীনের মাও সে তুং – এঁদের নিজ নিজ দেশের জন্য যে অবদান, বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান তাঁদের থেকে অনেক অনেক বেশি। পাশাপাশি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন প্রথিতযশা সাংসদ Lord Fenner Brockway বলেন:

In a sense, Sheikh Mujib is a greater leader than George Washington, Mahatma Gandhi and De Valera.
(Bangabandhu : An unparalleled genius | Independent, .theindependentbd.com › printnews)

আব্রাহাম লিংকন এর ভাষণ বর্ণবাদ বিলুপ্তির জন্য, চার্চিলের ভাষণ দেশের স্বাধীণতা সংরক্ষণ করার জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ভূখন্ড দিয়েছে, দিয়েছে আমাদের আত্মপরিচয়। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের বিচারে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং আমাদের জাতির পিতা।

প্রাসঙ্গিক বিষয়টির অবতারণা করা প্রয়োজন। তা হলো যে, বঙ্গবন্ধু শহীদ সাহেবের নেতৃত্বের মধ্যে কায়মনে নিজের অনুসরণীয় জনবান্ধব রূপটি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন বলেই শহীদ সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে মুসলীম লীগকে জনবিচ্ছিন্ন নবাবজাদাদের পকেট থেকে বের করে জনগণের সংগঠনে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন: “শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই, জনগণের প্রতিষ্ঠান করতে চাই। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে। পরিণত হয় নাই । জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল।”৬

১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে বাংলার মানুষের প্রতি কেন্দ্রীয় ইংরেজ সরকারের আচরণ বঙ্গবন্ধুকে এক নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, বাংলা যতদিন না বাংলার মানুষের শাসনাধীন হচ্ছে ততদিন এর জনগণের অবস্থা নিম্নগামীই হতে থাকবে শুধু। লুটেরা ইংরেজের শাসনে বাংলার হতশ্রী অবস্থা তাঁকে মর্মে দগ্ধ করতে থাকে: “যুদ্ধ করে ইংরেজ, আর না খেয়ে মরে বাঙালি; যে বাঙালির কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলাদেশ দখল করে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায়, তখন বাংলার এত সম্পদ ছিল যে, একজন মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী গোটা বিলাত শহর কিনতে পারত। সেই বাংলাদেশের এই দুরবস্থা চোখে

দেখেছি যে, মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার দুধ চাটছে।”৭ এই উপলব্ধিই বঙ্গবন্ধুর ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের পথ বাতলে দেয় অপরের শাসন-শোষণের নিগড় থেকে বাঙালির মুক্তিই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান হয়ে ওঠে। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সরব সমর্থক এবং সক্রিয় কর্মী ছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব পশ্চিমে দু’টি স্বাধীন সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রের । তাই ১৯৪৭-এ যখন দেশভাগ হলো তখন তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল এবং তিনি বুঝতে দেরী করেননি যে বাঙালির মুক্তি হয়নি।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হল। সেই দিন বুঝতে বাকি রইল না যে, বাংলাদেশকে উপনিবেশ করার জন্য, বাংলার মানুষকে শোষণ করে গোলামে পরিণত করার জন্য তথাকথিত স্বাধীনতা এসেছে। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৪৭ সালে কলকাতার পার্ক রোডের সিরাজউদ্দৌলা হোস্টেলে এক ঘরোয়া বৈঠক করি।… কলকাতা থেকে বিএ পাস করে ঢাকায় এলাম। ঢাকায় এসে রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে বুঝতে বাকি রইল না যে, বাঙালি শেষ হয়ে গেছে। সেই দিন শপথ নিলাম, বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে হবে। ১৯৪৭ সালেই হল আমাদের সংগ্রামের সূচনা।৮
পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাঙালি, তার ইতিহাস, তার ঐতিহ্যের পক্ষে সরব হওয়া প্রথম মানুষটি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি বলেন:

Sir, you will see that they want to place the word ‘East Pakistan’ instead of ‘East Bengal’. We have demanded so many times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word ‘Bengal’ has a history, has a tradition of its own. You can change it only after the people have been consulted. If you want to change it then we have to go back to Bengal and ask them whether they accept it.

(জনাব স্পীকার, আপনি দেখবেন তারা পূর্ব বাংলার নাম পাল্টে পূর্ব-পাকিস্তান রাখতে চায়। ‘বাংলা’ নামটি ব্যবহারের পক্ষে আমরা এতোবার দাবী করে আসছি যে আপনাদের পাকিস্তানের বদলে বাংলা বলা উচিৎ। বাংলা অভিধাটির পেছনে একটি ইতিহাস আছে; আছে নিজের একটি ঐতিহ্য। জনগণের সাথে কথা বলেই কেবল আপনারা এটা বদলাতে পারেন। যদি এই নাম পরিবর্তন করতেই হয়, তবে বাংলার মানুষের সামনে এই প্রশ্ন রাখা উচিৎ, তারা তাদের পরিচয় পরিবর্তিত হতে দিতে ইচ্ছুক কী না।)

বাংলা ও বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধুর এই অনুভব ধীরে ধীরে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণের সাথে সমানুপাতিকভাবে পরিণত হয়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দীদের অন্যতম।
গগণবিস্তারী হৃদয়ে প্রোথিত ছিল মুক্তপ্রাণ বাঙালির অবিনাশী চেতনা। তিনি সেই চেতনা সঞ্চারিত করেছিলেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। স্বীয় অধিকারবোধের সেই চেতনা বাঙালিকে দিয়েছে মুক্তির দিশা, পৌঁছে দিয়েছে তাকে স্বাধীনতার সুবাসিত বন্দরে, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক বঙ্গসন্তান গর্বোদ্ধত মাথা আকাশে তুলে তার আপন ভাষায় চিৎকার করে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশূ করতে পারে। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু এ জাতির অবিসংবাদিত পিতা। এবছর সেই জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আমরা সাড়ম্বরে উদযাপন করছি। ২০২০ সাল মুজিববর্ষ। আমরা চাই যে, মুজিববর্ষ উদযাপনের সার্বক্ষণিক অনুষঙ্গ হয়ে থাকবে মানুষকে ভালোবেসে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেবার শিক্ষা যা বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন দিয়ে আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।

আজ জাতির পিতার অনেক আরাধনার এই দেশ তাঁরই আদর্শে, তাঁরই সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, দেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নসহ দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করছে এবং অন্যান্য দেশের কাছে একটি ঈর্ষণীয় মডেল দেশ হয়েছে। মুজিব শতবর্ষে আজ বঙ্গবন্ধুর মহান চেতনার প্রতিপাদন অত্যন্ত জরুরি। আসুন আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সকল অপশক্তিকে পরাজিত করি। তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত ও প্রজ্ঞাবান নির্দেশনায় বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলবোই – এই হোক আজ আমাদের অঙ্গীকার।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক!

তথ্যসূত্র:
১. শেখ হাসিনা। শেখ মুজিব আমার পিতা । ঢাকা: আগামী প্রকাশনী। ২০১৭, পৃ. ২৫।
২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।
৩. শেখ মুজিবুর রহমান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী। ঢাকা: ইউপিএল। ২০১৪, পৃ. ১১।
৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯।
৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭।
৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
৮. শামসুজ্জামান খান। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা । ঢাকা: কথাপ্রকাশ। ২০১৮, পৃ. ২১।
৯. শেখ মুজিবুর রহমান। কারাগারের রোজনামচা । ঢাকা: বাংলা একাডেমী। ২০১৭, পৃ. ২৬৯।

লেখক: কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, মিডিয়া ব্যক্তিত্¦, ফোকলোরিস্ট, ইংরেজির অধ্যাপক এবং সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ

Related posts

Leave a Comment